TAG | prothom alo
অনেক দিন পর আনিসুল হকের সাথে দেখা। গতকাল ছবিটি তুলেছিলাম প্রথম আলোতে।

anisul hoque · ca bhaban · nirjhar · photo · portrait · prothom alo
এক.
পাড়ার লোকেরা তোতামিয়ার বাকপটুতায় বড়ই অস্থির ছিল । তোতার মুখের লাগাম নাই , এই যুগে যে কানাকে কানা বলিও না’র মতো সাদাকে সাদা বলিও না আর কালাকে কালা বলিও না বলিয়াও সুশীল নীতি আছে , তোতা তা বুঝিতে পারে না ।
সে অবলীলায় পাড়ার মুরুব্বি আখতার উকিলরে প্রশ্ন করিয়া বসে , আপনার ঘরের বালিকা বান্দীটি প্রেগনেন্ট হইল কী প্রকারে ? সে কানা খসরুকে গুন্ডা বলিয়া একদিন মাইরও খাইয়াছে । এহেন ঠোঁটকাটা তোতা মিয়াকে দেখিলেই তাই আমাদের মাঝে এক ধরনের ভীতি কাজ করিত ।
আমরা যারা রোজ সন্ধ্যার সময় অফিস হইতে ফিরিবার পথে বিমলের দোকানে টোস্ট বিস্কুট ভিজাইয়া চা খাইতাম আর রাজা উজির মারিতাম , তাহারা তোতার এহেন কর্মকান্ডে একদিকে যেমন সন্ত্রস্ত ছিলাম অন্যদিকে তোতার মতো লোকের প্রতিভা এইভাবে বিনষ্ঠ হইয়া যাইতেছে বলিয়া আফসোস করিতাম ।
তোতার টাকা পয়সা নাই , সর্বোপরি সে নেতানেত্রীদের তেলাইতে পারে না , তাই রাজনীতিতে তাহার কোন ভবিষ্যৎ দেখি না । লেখালেখি করিতে হইলে পত্রিকার সম্পাদকের সাথে খায় খাতির রাখা লাগে , তোতা তার এই মুখরা স্বভাব নিয়া সেই কাজও করিতে পারিবে না ।
তাহা হইলে তোতার কী হইবে ? তাহার কথা কি এই দেশের আপামর জনতা শুনিতে পাইবে না ? এইসব ভাবিয়া আমরা চিন্তায় চিন্তায় অস্থির ছিলাম ।
দুই .
এমনই এক বাদলা দিনে আমাদের বিমলের আড্ডার অনিয়মিত সদস্য মোখতারুদ্দিন একটি সংবাদ লইয়া ইউরেকা ইউরেকা বলিয়া সেই বটতলা মাতাইয়া উঠিল । সকলেই জিজ্ঞাস্য দৃষ্ঠিতে তার দিকে তাকাইলাম ।
মোখতারুদ্দিন বলিল – তোতা কাহিনীর সমাধান হইয়াছে । তোতা মিয়া যাহা ভাবে , যাহা মনে করে , যাহা তার বলিবার অধিকার সব কিছু রক্ষিত করিবার ,প্রকাশ করিবার অধিকার পাইয়াছে ।
মোখতারুদ্দিন এককালে ‘ বাংলাদেশ শ্রমজীবি চিন্তক আন্দোলন ( মো-উ) নামের একসদস্য বিশিষ্ঠ দলের সভাপতি এবং বিপ্লবী সাধারন সম্পাদক ছিল , সুতরাং তাহার এইসব "অধিকার ""রক্ষিত" এইসব শব্দকে ফিল্টার করিয়া ফেলিয়া আমরা যা বুঝিলাম যে , তোতা মিয়ার কন্ঠকে সকলের সামনে উপস্থিত করিবার এক দারুন মওকা পাওয়া গিয়াছে ।
মোখতারুদ্দিন জানাইল – মানুষের বাকস্বাধীনতার অঙ্গীকার একমাত্র ব্লগের মাধ্যমেই উপস্থাপন করা যাইবে । তোতা মিয়ার যা খুশী , যখন খুশী তখনই সে সেইগুলা নিজের কী বোর্ড চাপাইয়া চাপাইয়া লিখিয়া ফেলিবে , বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তাহা পড়িয়া তোতামিয়ার মনোভাব বুঝিতে পারিবে , এইখানে কোন মারপ্যাচ নাই ।
তিন.
অত:পর তোতামিয়াকে ব্লগিং শিক্ষা দিবার মানসে মোখতারুদ্দিন তাহাকে নিয়া স্থানীয় সাইবার ক্যাফেতে প্রবেশ করিল । একই বুথে দুইটি ছেলেকে প্রবেশ করিতে দেখিয়া ক্যাফের ছোকরা ছেলেটা কিঞ্চিত হাসিলেও তারা উভয়ে সেদিকে নেত্রপাত করিল না ।
মোখতারুদ্দিন নবগঠিত একটি ব্লগ খুলিয়া তোতামিয়াকে আমন্ত্রন জানাইয়া কহিল – লেখ ।
তোতা জিজ্ঞাসিল – কী লিখিব ?
: যাহা ইচ্ছা তাহা লিখ ।
: প্রথমে তাহা হইলে নিজের পরিচিতমূলক একটি লেখা দেই । এই বলিয়া তোতা লিখিল – আমার নাম তোতা ।
মুখতারুদ্দিন হা হা করিয়া উঠিল – ইহা লিখিতে পারিবে না । নীতিমালায় আটকাইবে । কোন মনুষ্য যদি পক্ষীর নাম ধারন করে তাহা হইলে ইহা পক্ষী সমাজের অবমাননা । পক্ষীর অবমাননা নিয়া লিখিতে পারিবে না ।
তোতা কহিল – তাহা হইলে আমি আখতার উকিলের ঘরের বান্দীটির রহস্যজনক প্রেগনেন্ট হওয়া নিয়া লিখিব ।
মোখতারুদ্দিন কহিল – না না , ইহা কেমনে লিখিবে ? নীতিমালায় আছে -"প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ অনুসারে শ্রদ্ধেয় কোনো ব্যক্তিকে হেয় করে কোনো মন্তব্য করা যাবে না।" আখতার উকিল আমাদের পাড়ার শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি , তাহার নামে কিছু লিখিতে পারিবে না ।
তোতা কহিল – আমি তাহা হইলে আন্তর্জাতিক বিষয়েই লিখুম । আমেরিকা যে আমাদের চুষিয়া খাইতেছে , তাহা লিখিব ।
— না, তা লিখিতে পারিবে না । কারন নীতিমালায় আছে "দেশীয় বা দেশের বাইরের কোনো জাতি, গোষ্ঠী, ভাষা ও ধর্মের প্রতি অবমাননামূলক বা কারো অনুভূতিতে আঘাত দিতে পারে এমন কোনো লেখা প্রকাশ করা যাবে না।"
তোতা এবার কহিল , আমি কি তাহা হইলে ইজরায়েলের গুন্ডামি নিয়া লিখিতে পারিব না ?
- তা সম্ভব নহে । ইজরায়েলের অনুভূতিতে আঘাত করিতে পারিবে না । তাহা ছাড়া নীতিমালায় আরো আছে – " বিবদমান দুই বা ততোধিক জাতি, গোষ্ঠী ও ধর্মের মধ্যে জাতিগত সংঘর্ষের উস্কানি দিতে পারে এমন লেখা প্রকাশ করা যাবে না।" তোমার লেখায় প্যালেস্টাইন আর ইজরায়েলের মাঝে সংঘর্ষের উস্কানি প্রকাশ পাইতে পারে ।
তোতা বিরক্ত হইয়া বলিল – তাহা হইলে আমি কী ঘোড়ার ডিম লিখিব ? সমাজের কারো কথাই তো লিখিতে পারিতেছি না । আমি কি তবে আফ্রিকার জঙ্গলের নরমাংস ভোগী জংলীদের নিয়া লিখিব ?
- উহু , তাহা লিখিতেও অসুবিধা আছে । নীতিমালায় বলিয়াছে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্ম, সংস্কৃতি, আচার, জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস বা ভাষাকে কটাক্ষ বা অবমাননা করে কোনো বক্তব্য দেওয়া যাবে না।
তোতা হাসিয়া কহিল – এতো দেখি কোন পথই বাকী নাই । সবই যদি বাদ যায় , তাহা হইলে কি তাবলীগের ফজিলত নিয়া পুস্টাইব নাকি ?
- তা বোধহয় করিতে পারিবে না । কারন নীতিমালা বলিতেছে –
ধর্মগ্রন্থের বাণী ত্রুটিপূর্ণভাবে উদ্ধৃত করা যাবে না। এমনভাবে ধর্মগ্রন্থের বাণী উদ্ধৃত করা যাবে না, যাতে ধর্ম বা বাণীর অসম্মান হয়। তুমি নিশ্চয়ই জানো যে তাবলীগের ব্যাপারে সকল আলেম ওলামা একমত নহেন । মাওলানা সাঈদী ধর্মগ্রন্থের আলোকে তাবলীগকে উড়াইয়া দিয়া ওয়াজ করেন । সুতরাং তুমি যদি ফজিলত প্রকাশ করিতে গিয়া কোন বাণী উদ্ধৃত করো , তাহা সাঈদীর কাছে ত্রুটিপূর্ণ মনে হইতে পারে ।
সাঈদীর কথা মোখতারুদ্দিনের কাছে শুনিয়া তোতা বলিল – বেড়ে বলিয়াছ । ঐ রাজাকার শুওরের বাচ্চার বিরুদ্ধেই না হয় লিখিব ।
- তাহা কিভাবে লিখিবে ? নীতিমালা দেখ , ইহাতে বলা হইয়াছে "রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি ব্যক্তিগত বিদ্বেষ প্রচার করা যাবে না।"
তোতা এইবার মাথা চুলকাইয়া বলিল "সাঈদী কিংবা গোলাম আযমের প্রতি আমার তো কোন ব্যক্তিবিদ্বেষ নাই । ইহারা রাজাকার । তাহা বলিতে অসুবিধা কোথায় !
- বলিতে অসুবিধা কারন নীতিমালায় আছে "সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা যাবে না।" এবং আরো আছে "সমাজে বিতর্ক আছে এমন বিষয়ে মন্তব্য ও লেখা প্রকাশ করতে হলে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তা করতে হবে।"
এখন রাজাকার নিয়া ঢ়াজাকারদের মাঝে বিভ্রান্তি আছে । কিছু বলিলেই তাহারা বলে আদালতে প্রমান হওয়ার আগে গোলাম আযম , কামরুজ্জামান , নিজামী ইহাদেরকে খুনী বলা যাইবে না । সুতরাং নীতিমালা অনুযায়ী তুমি ইহা লিখিতে পারিবে না ।
তোতা বলিল – ঐ সব পলিটিক্যাল বক্তব্য ছাড়িয়া দাও । ইহারা এইসব বলিয়া মাঠ গরম করে । আসো রাজাকার প্রতিরোধ করি , মৌলবাদ প্রতিরোধ করি । এই আহ্বান নিয়া আসো লেখালেখি করি ।
মোখতারুদ্দিন কহিল – কিন্তু ছাড়িবার উপায় নাই । নীতিমালা বলিতেছে "রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দাঙ্গা-পরিস্থিতির বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণ হতে পারে এমন লেখা প্রকাশ করা যাবে না।" সুতরাং উহাও তুমি লিখিতে পারিবে কি না সন্দেহ হইতেছে ।
তোতা কহিল – বুঝিলাম । আমার দরকার নাই তাহা হইলে রাজনৈতিক প্যাচালে জড়াইয়া । শালার বাচ্চারা দুধের মাঝে মেলামাইন দিয়া শিশু মারিয়া ফেলিতেছে । এই সব রেডকাউ , ডানো , ইয়াশলীর বিরুদ্ধে জনমত গড়িব ।
মোখতার কহিল – করো কী ! করো কী! নীতিমালা বলিতেছে
" কোনো ব্র্যান্ডের সুনাম ক্ষুণ্ন করার জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে নেতিবাচক লেখা দেওয়া যাবে না।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নাগারের উদ্ধৃতি দিয়া তুমি এই ব্রান্ডগুলোর বিরুদ্ধে এখন কিছু লিখিলেই নীতিমালায় আটকাইবে । তাহার চাইতে কিছু শিশু মরিয়া যাউক , কিন্তু তুমি বিদেশী রসায়নাগারের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা কর ।
তোতা এইবার হতাশ হইয়া বলিল – তাহা হইলে আমি কী নিয়া লিখিব ?
মোখতারুদ্দিন কহিল – তুমি তো এখন লিখিতে পারিবে না । কারন আগে তোমাকে আইনের বই পড়িতে হইবে । নীতিমালা বলিয়াছে "ক) বাংলাদেশে প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করে কোনো লেখা প্রকাশ করা যাবে না।
খ) কোনো লেখার মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত আইন-কানুন লঙ্ঘন করা যাবে না।"
সুতরাং আগে তোমাকে কিছুদিন দেশী বিদেশী আইনের গ্রন্থ অধ্যয়ন করিতে হইবে । তাহারপরে লিখিবার সুযোগ পাইবা । তবে এ জন্য তোমাকে কিছু টাকাকড়ির সংস্থানও রাখিতে হইবে ।
তোতা জিজ্ঞাসিল – ব্লগিং করিতে টাকা লাগে নাকি ?
মোখতার কহিল – তা লাগে না । তবে উকিলের টাকা রেডি রাখিও । নীতিমালা বলিয়াছে কোন মামলা হইলে তোমাকে তার টাকা দিতে হইবে ।
তিন.
তাহার পরে বহুদিন গত হইয়াছে । তোতা মিয়াকে আর বিমলের দোকানের আড্ডায় দেখি না । সে আড্ডা ছাড়িয়া ব্লগিংয়ে মন দিয়াছে বলিয়া শুনিতে পাই ।
এক শুক্রবারে কাঁচাবাজার করিতে গিয়া তাহার সাথে দেখা ।
জিজ্ঞাসিলাম – তোতা মিয়া কেমন আছ ?
তোতা বলিল – উঁ !
- তোমার বউ কি ভালো আছে ? বাচ্চা দুইটার কী খবর ?
- উঁ !
- আড্ডায় আর আসিবে না ?
- উঁ !
বিরক্ত হইয়া কহিলাম – কী সেই থেকে " উঁ" উঁ" করিতেছ ? কথা বলিতে ভুলিয়াছ নাকি ?
তোতা দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া করুণ কন্ঠে বলিল – এর চাইতে বেশি বলিবার উপায় নাই ।
নীতিমালায় আটকাইবে ।
———————————–
ফুটনোট :
১. প্রথম আলোর গঠনপক্রিয়ায় একজন রোজকামলা শ্রমিক ছিলাম । সে সময় আমি , সুমন্ত আর আশীফ এন্তাজ রবি ‘ আলপিন " নামের হাস্যরসাত্মক একটি ম্যাগাজিন বের করতে প্রানান্ত শ্রম দিতাম ।
কনসেপ্ট নতুন ছিল । আমরা লোকজনের হাসির অধিকারকে সমুন্নত রাখতে পেরেছিলাম ।
২.আজ সেই আলপিনও নেই , তাই সেই হাসাহাসিও নেই।
নতুন কনসেপ্ট প্রথম আলো ব্লগ ,আর তার নীতিমালা ।
আলপিনের সাফল্য কামনা করেছিলাম , প্রথম আলো ব্লগের নীতিমালারও সাফল্য কামনা করি ।

bangla blog · jebtik · prothom alo · prothom-aloblog · rules






Amit’s Blog
Christoph Jan’s Blog
Emran’s Blog
Hasin’s Blog
Mark Cuban’s Blog
Mehfuz’s Blog
Mithu’s Blog
Mouly’s Blog
Omar Al Zabir
Saqib’s Blog
Shafqat Ahmed’s Blog
Shahed’s Blog
Shahidul News
Magnum